১০:১৬ অপরাহ্ণ - শুক্রবার, ২১ সেপ্টেম্বর , ২০১৮
Breaking News
Download http://bigtheme.net/joomla Free Templates Joomla! 3
Home / জরুরী সংবাদ / পাবনায় নিজামীর নির্দেশে গলা কাটা মুক্তিযোদ্ধা এখনো বেচে আছেন

পাবনায় নিজামীর নির্দেশে গলা কাটা মুক্তিযোদ্ধা এখনো বেচে আছেন

pabna  14.12.15পাবনা, ১৫ নভেম্বর ২০১৫ (বাংলা-নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম):  নিজামী সেদিন দাঁড়িয়ে থেকে বলেছিলেন, ‘এই শালাদের গলা কাট’। প্রথমে বুকে এবং বাম কানের নিচে বেয়োনেট চার্জ করে নৃশংসভাবে নির্যাতন চালানো হয়। তিনি তখনও মরেননি দেখে সাত্তার রাজাকার তখন পাকসেনাদের উর্দ্দু ভাষায় চেঁচিয়ে বলেন, ‘ইয়ে সালা জিন্দা হ্যায়-সালেকো কুরবানি কর’। এরপর মাটিতে ফেলে নিজামীর নির্দেশে তার গলায় ছুরি চালানো হয়, কাটা হয় গলা। অন্য মুক্তিযোদ্ধাকে গুলি করে, কাউকে বেয়োনেটে চার্জ করে হত্যা করে রাজাকাররা। এ সময় ভাগ্যক্রমে পালিয়ে প্রাণে রক্ষা পান মাজেদ ও মোসলেম নামে দুই মুক্তিযোদ্ধা।

এ কথাগুলো পাবনায় একাত্তরের রাজাকারের হাতে গলা কাটার পরও বেঁচে যাওয়া মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহানের। একাত্তরে তিনি নিজের উপর ঘটে যাওয়া নৃশংসতার বর্ণনা করেন ঠিক এভাবেই। তার শেষ ইচ্ছে ছিল একাত্তরের রাজাকার জামায়াত নেতা মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির রায় কার্যকর দেখে যাওয়া কিন্তু হলো না তার ইচ্ছেপূরণ। তার আগেই গত বৃহস্পতিবার রাত আড়াইটার দিকে পাবনা জেনারেল হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় না ফেরার দেশে চলে যান।

একাত্তরে রাজাকারদের উপস্থিতি ও নির্দেশে মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান আলীর গলাকাটার পরও সৌভাগ্যক্রমে বেঁচে যান। তারপর থেকে সবাই তাকে মুক্তিযোদ্ধা গলাকাটা শাহজাহান নামেই চিনত।

সম্প্রতি যুদ্ধাপরাধী নিজামীকে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনাল ফাঁসির আদেশ দেন। নিজামীর মামলার রাষ্ট্রপক্ষের এই অন্যতম সাক্ষী শাহজাহান আলী ওরফে গলাকাটা শাহজাহান ফাঁসির রায় শুনে গেলেও ফাঁসি কার্যকর দেখে যেতে পারলেন না।

যুদ্ধাপরাধী নিজামীর রাষ্ট্রপক্ষের সাক্ষী হওয়ার পর থেকে সেই সময়ের প্রত্যক্ষদর্শী এই মুক্তিযোদ্ধাকে বিভিন্ন সময়ে স্থানীয় জামায়াত-শিবিরের পক্ষ থেকে হুমকি-ধামকি দেয়া হতো। অথচ তিনি সেই হুমকি ধামকিকে কখনও তোয়াক্কা করেননি। সাহসের সঙ্গে সাক্ষী দিয়েছেন। কিন্তু এতো কিছুর পর যুদ্ধাপরাধী রাজাকার মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসি না দেখে চলে গেলেন চিরতরে। তিনি জামায়াত-শিবিরসহ মৌলবাদী গোষ্ঠীর একের পর এক হুমকি ধামকিতে অস্বস্তিতে ছিলেন বলে পারিবারিকভাবে জানা যায়। এরই ধারাবাহিতকায় বৃহস্পতিবার তিনি অসুস্থ হয়ে পড়েন। পরিবারের লোকজন দ্রুত পাবনা জেনারেল হাসপাতালে ভর্তি করেন। মৃত্যুকালে তার বয়স হয়েছিল ৬৯ বছর। তিনি স্ত্রী, এক ছেলে ও এক মেয়েসহ অনেক গুণগ্রাহী রেখে গেছেন।

জেলার সাঁথিয়া উপজেলার বনগ্রাম সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে শুক্রবার বাদ জুমা তার নামাজে জানাজা অনুষ্ঠিত হয়। পরে গাঙ্গুহাটি করবস্থানে দাফন করা হয়। এর আগে বিদ্যালয় মাঠে মরহুম মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান আলী ওরফে গলাকাটা শাহজাহানকে দেয়া হয় গার্ড অব অনারে মাধ্যমে রাষ্ট্রীয় সন্মান দেখানো হয়।

জীবিত থাকাবস্থায় এ প্রতিবেদককে শাহজাহান আলী ওরফে গলাকাটা শাহজাহান বলেছিলেন, ‘৪৩ বছর ধরে এই দিনটির অপেক্ষায় আছি, রাজাকার নিজামীর ফাঁসি দেখে মরতে চাই।’

কিন্তু বিধিবাম। তিনি রায় শুনে যেতে পারলেও রাজাকার নিজামীর ফাঁসি কার্যকর দেখে যেতে পারলেন না। সেই সময় শাহজাহান আলী বলেছিলেন, ‘নিজামীসহ সব যুদ্ধাপরাধীর ফাঁসি দেখে মরতে পারলেই আমার সারা জীবনের চাওয়া-পাওয়া পূরণ হবে।’

মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় নিজামীর নির্দেশে স্থানীয় রাজাকাররা গলাকাটার পরেও প্রাণে বেঁচে যাওয়া যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা শাহজাহান আলী ওরফে গলাকাটা শাহজাহান এভাবেই তার আকুতি জানিয়ে যুদ্ধাপরাধীদের বিচার দাবি করে ফিরছেন মহান স্বাধীনতার দীর্ঘ ৪৩ বছর ধরে। আর ৪৪ বছরের মাথায় এসে তার জীবনাবসান হল। পূরণ হলো তার সেই আশা।

পাবনা জেলার সাঁথিয়া উপজেলার বনগ্রামের ২০ বছর বয়সী শাহজাহান আলী ১৯৭১ সালে মহান মুক্তিযুদ্ধের সময় দশম শ্রেণির ছাত্র ছিলেন। ৭ ভাই ও ৪ বোনের মধ্যে শাহজাহান সবার বড়। ১৯৭১ সালের ১৪ জুন ভারতে যান ট্রেনিং নিতে। শিলিগুড়ি পাটিঘাঁটি এলাকায় ২১ দিন ট্রেনিং গ্রহণ করে দেশে ফিরে শাহজাহান আলী মহান মুক্তিযুদ্ধে ঝাঁপিয়ে পড়েন। তিনি যুদ্ধ করেন পাবনার শানিকদিয়ার চর, ইন্ডিয়ার বর্ডার ও চাঁপাইনবাবগঞ্জের ৯ নম্বর সেক্টরে। ১৯৭১র ২৭ নভেম্বর শাহজাহান আলীসহ ১১ জন মুক্তিযোদ্ধাকে ধরে নিয়ে যায় পাকিস্তানি সেনাবাহিনী। পাকসেনারা তাদের ধরে নিয়ে স্থানীয় আলবদর-আলশামস, রাজাকারদের হাতে তুলে দেয় হত্যা করার জন্য।

রাজাকাররা তাদের নিয়ে যায় পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার ধূলাউড়িতে (বর্তমান বধ্যভূমি)। ধূলাউড়ির বর্তমান সেই বধ্যভূমিতে মতিউর রহমান নিজামীকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখেন মুক্তিযোদ্ধারা। সে সময় নিজামী সাঁথিয়া এলাকার রাজাকার কমান্ডার সাত্তার, আফতাব, সালামসহ অন্যান্য রাজাকারদের নির্দেশ দেয় মুক্তিযোদ্ধাদের খতম করার।

সেদিন নিজামীর নির্দেশেই পাবনার সাঁথিয়া উপজেলার ধূলাউড়ির এই বধ্যভূমিতে রাজাকাররা সেদিন একে একে হত্যা করে রঘুনাথপুর গ্রামের চাঁদ আলী বিশ্বাস, পদ্মবিলা গ্রামের খবির উদ্দিন, দ্বারা মিয়া, সুজানগরের শাহজাহান আলী, মহসিন উদ্দিন, আকতার আলম ও মোকছেদ মিয়াসহ ৯ জন বীর মুক্তিযোদ্ধাকে। আর শাহজানকে মৃত্যু নিশ্চিত করতে গলা কেটে ফেলে।

তারপর সেদিন রাজাকাররা শাহজাহানকে মৃত ভেবে ফেলে রেখে চলে যান। মুক্তিযোদ্ধাদের ধরে নিয়ে যাবার খবর অপর সহযোদ্ধাদের কাছে পৌঁছালে ওইদিন মুক্তিযোদ্ধা সালাম ও আফতাবের নেতৃত্বে একদল মুক্তিযোদ্ধা ঘটনাস্থল যান এবং শাহজাহানকে পড়ে থাকতে দেখেন। তারা শাহজাহানকে উদ্ধার করে মুমূর্ষু অবস্থায় প্রথমে স্থানীয়ভাবে ও পরে পাবনা সদর হাসপাতালে তাকে চিকিৎসা করান।

স্বাধীনতার পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে চিকিৎসা করানো হয়। কয়েক বছর আগেও শাহজাহান আলী ওরফে গলাকাটা শাহজাহান বারডেম হাসপাতালে গলার অপারেশন করেছিলেন।

শাহজাহান আলী মৃত্যুর আগে এই প্রতিবেদকের কাছে বলেন, ‘‘অষ্টম জাতীয় সংসদ নির্বাচনের আগে নির্বাচনী প্রচারণার কাজে নিজামী সাঁথিয়াতে আসে। আকস্মিকভাবে দেখা হয় আমার সঙ্গে। আমার সামনে এসে হাত দুটি বাড়িয়ে দেয় হ্যান্ডশেক করার জন্য। আমি তাকে তখন বলেছি, ’সর শালা মাদারচোৎ’।’’

এভাবেই নিজের ক্ষোভের কথা সাংবাদিকদের কাছে প্রকাশ করেছিলেন যুদ্ধাহত মুক্তিযোদ্ধা মো. শাহজাহান আলী (৬৯)। আন্তর্জাতিক অপরাধ দমন ট্রাইব্যুনালের তদন্ত দলের সদস্যরা পাবনায় আসলে তিনি সাক্ষ্যও দিয়েছেন। তদন্ত কমিটি ও সাংবাদিকদের কাছে অনেক কথা বলেছেন ১৯৭১ এ নিজামীর কুকীর্তি এবং মানবতাবিরোধী হত্যাযজ্ঞ-নির্যাতন সম্পর্কে।

পাবনা শহরের শালগাড়ীয়া মহল্লার জামাই শাহজাহান আলী সাংবাদিকদের সঙ্গে আলাপকালে ওই সময় বলেন, ‘আমার এক ছেলে ও এক মেয়ে। দু’জনকেই বিয়ে দিয়েছি। মাসিক ৮ হাজার টাকার মতো মুক্তিযোদ্ধা ভাতায় বর্তমানে তার সংসার চলে। কিছু জমি-জমাও রয়েছে তার। সবমিলিয়ে সংসার ভালোভাবেই চলে তার। আমি যুদ্ধাপরাধী নিজামীর ফাঁসি চাই। এটা আমার জীবনের শেষ চাওয়া পাওয়া।’

যুদ্ধাহত এই মুক্তিযোদ্ধার চাওয়া পাওয়ার একটি পূরণ হলেও বাকিটা পূরণ না হতেই চলে যেতে হলো তাকে না ফেরার দেশে। এখন পাবনার মুক্তিযুদ্ধের স্বপক্ষের শক্তিদের একটাই দাবি দ্রুত যুদ্ধাপরাধীর রাজাকার মতিউর রহমান নিজামীর ফাঁসির রায় কার্যকর করে গলাকাটা শাহাজাহানের আত্মার শান্তি নিশ্চিত করা। সৌজন্যে বাংলামেইল

অন্যরা য়া পড়ছে...

Loading...



চেক

বিকল্পের সন্ধানে কোটা বাতিলের প্রজ্ঞাপনে দেরি হচ্ছে : ওবায়দুল কাদের

ঢাকা, ১৩ মে ২০১৮ইং (বাংলা-নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম): প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা অনুযায়ী সরকারি চাকরিতে কোটা …

স্যাটেলাইট মহাকাশে ঘোরায় বিএনপির মাথাও ঘুরছে : মোহাম্মদ নাসিম

ফেনী, ১৩ মে ২০১৮ইং (বাংলা-নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম): বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মহাকাশে উৎক্ষেপণ হওয়ায় বিএনপির মাথাও ঘুরছে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

My title page contents