ঢাকা, ০৪ জুন, ২০১৭ইং (বাংলা-নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম): গুলশানের এক বিঘা ১৩ কাঠা জমির ওপর আলোচিত সেই বাড়ি না ছাড়ার ঘোষণা দিয়েছেন বিএনপি নেতা মওদুদ আহমদ। আপিল বিভাগে তার রিভিউ আবেদন খারিজ করে দেয়ার পর তিনি বলেন, এই রায়ে সরকারকে বাড়ির স্বত্ত্ব দেওয়া হয়নি, অধিকার দেওয়া হয়নি। তিনি বলেন, ‘আমরা মূল মালিকের সঙ্গে বোঝাপড়া করব। উনার ছেলে করিম সুলায়মান আছেন। তাছাড়া আদালতও কিছু পর্যবেক্ষণ দেবেন।’

গত তিন দশক ধরে গুলশান-২ এর ১৫৯ নম্বর প্লটের বাড়িতে বসবাস করছেন মওদুদ। তার ভাইয়ের নামে জমিটির নামজারি করা হয়েছিল। এক বিঘা ১৩ কাঠা জমির ওপর ওই বাড়ি অবৈধভাবে দখল ও আত্মসাতের অভিযোগে ২০১৩ সালের ১৭ ডিসেম্বর গুলশান থানায় মওদুদ ও তার ভাইয়ের বিরুদ্ধে এই মামলা করেন দুদকের উপ-পরিচালক হারুনুর রশীদ।

দুদকের তদন্ত কর্মকর্তা ২০১৪ সালের ২৬ মে ঢাকার মুখ্য মহানগর হাকিম আদালতে এ মামলার অভিযোগপত্র দিলে ওই বছর ১৪ সেপ্টেম্বর ঢাকার জ্যেষ্ঠ বিশেষ জজ আদালতের বিচারক তা আমলে নেন।

অভিযোগে বলা হয়, গুলশানের যে বাড়িটিতে মওদুদ আহমদ ও তার পরিবার থাকছেন, তার প্রকৃত মালিক ছিলেন পাকিস্তানি নাগরিক মো. এহসান। ১৯৬০ সালে তৎকালীন ডিআইটির কাছ থেকে এই বাড়ির মালিকানা এহসান পান। ১৯৬৫ সালে বাড়ির মালিকানার কাগজপত্র এহসানের স্ত্রী অস্ট্রিয়ার নাগরিক ইনজে মারিয়া প্লাজের নামে নিবন্ধন করা হয়।

১৯৭১ সালে মুক্তিযুদ্ধ শুরু হলে এহসান স্ত্রীসহ ঢাকা ত্যাগ করেন। তারা আর ফিরে না আসায় ১৯৭২ সালে এটি পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকাভুক্ত হয়। ওই বছরই মওদুদ ওই বাড়ির দখল নেন। এরপর ১৯৭৩ সালের ২ অগাস্ট তারিখে মওদুদ ইনজে মারিয়া প্লাজের নামে একটি ‘ভুয়া’ আমমোক্তারনামা তৈরি করান এবং নিজেকে তার ভাড়াটিয়া হিসেবে দেখিয়ে ওই বাড়িতে বসবাস করতে থাকেন বলে মামলায় অভিযোগ করা হয়।

দুদকের মামলায় বলা হয়, জিয়া সরকারের উপ প্রধানমন্ত্রী থাকাকালে মওদুদ প্রভাব খাটিয়ে বাড়িটি পরিত্যক্ত সম্পত্তির তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার চেষ্টা করেন। এর ধারাবাহিকতায় ১০০ টাকা মূল্য দেখিয়ে ১৯৮০ সালে প্লটটি তিনি বরাদ্দ নেন। পরে তিনি একটি বায়নানামা হাজির করেন, যেখানে দেখানো হয়, ওই বাড়ির মালিক ইনজে মারিয়া প্লাজ জনৈক মহসিন দরবারকে আমমোক্তার বানিয়েছেন এবং সেই মহসিন দরবার ১৯৮৫ সালে বাড়িটি মওদুদের সহোদর ভাই মনজুর আহমদের নামে বায়না করে দিয়েছেন। মওদুদ ওই অভিযোগ আমলে নেওয়ার আদেশের বিরুদ্ধে হাইকোর্টে ফৌজদারি রিভিশন আবেদন করেন। শুনানি নিয়ে গতবছর ২৩ জুন হাইকোর্ট তা খারিজ করে দেয়। হাইকোর্টের ওই রায়ের বিরুদ্ধে মওদুদ আপিলের আবেদন করলে আপিল বিভাগ তা মঞ্জুর করে। এ বিষয়ে দুদকের রিভিউ আপিল বিভাগ খারিজ করে দেওয়ায় মামলা থেকে অব্যাহতি পেলেন মওদুদ ও তার ভাই।

অস্ট্রীয় নাগরিক ইনজে মারিয়া প্লাজ ১৯৮৪ সালের ২৫ জুন বাড়ির বিষয়ে মহসিন দরবার নামের এক ব্যক্তিকে কথিত পাওয়ার অব অ্যাটর্নি (আমমোক্তারনামা) দেন। রাষ্ট্রপক্ষের নথিপত্রে দেখা যায়, ১৯৮৫ সালের ৩০ মার্চ ওই অস্ট্রীয় নাগরিক মারা যান। অথচ মামলাকারীপক্ষ (মওদুদের ভাই) তাদের নথিতে দেখায়, বাড়ি নিয়ে ওই বছরের ১০ আগস্ট তাদের মধ্যে বায়নানামা চুক্তি হয়। তবে চুক্তি বাস্তবায়ন না হওয়ায় মামলা করেন মওদুদ আহমদের ভাই। ১৯৯৩ সালের ২৩ জানুয়ারি তৎকালীন সাব জজ আদালত মামলাটি খারিজ হয়। ওই আদেশের বিরুদ্ধে ২০০১ সালের ২৩ অক্টোবর হাই কোর্টে প্রথম আপিল করেন মওদুদ আহমদের ভাই, যার ওপর চূড়ান্ত শুনানি নিয়ে ২০০৫ সালের ১৫ ডিসেম্বর হাইকোর্ট রায় দেয়।

আর বাড়িটি ছাড়তে আপিল বিভাগের দেওয়া রায় পুনর্বিবেচনার আবেদন (রিভিউ) খারিজ করেছে প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহারসহ আপিল বিভাগের পাঁচ বিচারকের বেঞ্চ। এর ফলে মওদুদকে সেই বাড়ি ছাড়তেই হবে বলে জানিয়েছেন অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম।

তবে রায়ের পর তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়ায় মওদুদ বলেন, ‘আমরা মূল মালিকের সঙ্গে বোঝাপড়া করব।’

বাড়ি ছাড়তে রাজউক পদক্ষেপ নিলে কী করবেন- সাংবাদিকদের এমন প্রশ্নের জবাবে মওদুদ বলেন, ‘দেশে কি আইন নাই? আমি আইনের আশ্রয় নেব। আদালতের আশ্রয় নেব। বাড়ি ছাড়ব না। আমি বিরোধী দলে আছি বলে আজকে এ মামলায় সাত বছর পরে আপিল করেছে সরকার।’

মওদুদের বাড়ি না ছাড়ার ঘোষণার বিষয়ে জানতে চাইলে অ্যাটর্নি জেনারেল মাহবুবে আলম বলেন, ‘এ বাড়ি তিনি ছাড়বেন না বা এ বাড়িতে যে তিনি থাকবেন, একজন রাজনৈতিক ব্যক্তিত্ব হিসেবে এ কথা বলাতো ধৃষ্ঠতা। আমি মনে করি, এর চেয়ে বড় ধৃষ্ঠতা আর হতে পারে না। অন্য যে কোনো দেশে হলে এ প্রশ্ন ওঠার সঙ্গে সঙ্গে রাজনীতিবিদ হিসেবে সম্মান রক্ষার স্বার্থে বাড়ি ছেড়ে দিতেন।’

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘তাকে বাড়ি অবশ্যই ছাড়তে হবে। বাড়িটা বর্তমানে নিয়ে নেওয়া সরকারের দায়িত্ব।’ তিনি বলেন, ‘অবৈধভাবে একজন লোক থাকবে আর সরকার সেটা মেনে নেবে, তা হতে পারে না।’

অ্যাটর্নি জেনারেল বলেন, ‘এ মামলায় মওদুদ সাহেব একটি পাওয়ার অব অ্যাটর্নি দেখিয়েছিলেন, যেখানে তার ভাই তাকে বাড়িটি দেখাশুনা করার দায়িত্ব দিয়েছেন। অথচ তার ভাইয়েরও সেখানে অধিকার নাই। তার মামলা ডিসমিস হয়ে গেছে উচ্চ আদালতে।’

মওদুদ আহমেদ মূল মালিকের সঙ্গে বোঝাপড়া করবেন এমন মন্তব্যের বিষেয়ে সে বিষয়ে মাহবুবে আলম বলেন, ‘মালিক তো বিদেশি। স্বাধীনতার পরে আসেনি কোনো সময়েই। এখানে ছিলই না। উনার এ সমস্ত কথা দুঃখজনক। মূল মালিকের সঙ্গে চুক্তি নিয়ে মামলায় হেরে গিয়ে এ কথা বলাও দুঃখজনক। অবশ্যই বাড়ি ছাড়তে হবে।’