৯:০০ অপরাহ্ণ - শনিবার, ২২ সেপ্টেম্বর , ২০১৮
Breaking News
Download http://bigtheme.net/joomla Free Templates Joomla! 3
Home / অপরাধ / কেরানী থেকে শিল্পপতি কাজী শাহনেওয়াজের অঢেল অবৈধ অর্থের তথ্য ফাঁস : জেলে প্রেরণ

কেরানী থেকে শিল্পপতি কাজী শাহনেওয়াজের অঢেল অবৈধ অর্থের তথ্য ফাঁস : জেলে প্রেরণ

ডাঃ আওরঙ্গজেব কামাল-খুলনা, ১২ অক্টোবর, ২০১৬ইং (বাংলা-নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম):  কেরানী থেকে কোটিপতি শাহনেওয়াজের অঢেল অবৈধ অর্থের রহস্য ফাঁস হতে শুরু করেছে। খুলনার রূপসায় মৎস্য প্রক্রিয়াজাতের আড়ালে নকল ওষুধের কারখানার সন্ধান এবং সেখান থেকে বিপুল পরিমাণ নকল ওষুধ উদ্ধারের ঘটনায় মামলা দায়ের করা হয়েছে।

গত সোমবার গভীর রাতে র‌্যাব-৬ খুলনার উপ-সহকারী পরিচালক (ডিএডি) নাজমুল হুদা বাদী হয়ে রূপসা থানায় এ মামলা দায়ের করেন। ১৯৭৪সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫ (গ) ধারায় এ মামলা রুজু হয়। মামলার আসামীরা হলেন  যে হিমায়িত মৎস্য প্রক্রিয়াজাত কারখানার আড়ালে নকল ওষুধ তৈরী হতো সেই কারখানার মালিক শিল্পপতি কাজী শাহনেওয়াজ এবং তার সহযোগী জাকির হোসেন, সজীব ও হাবিবুর রহমান। এছাড়াও অজ্ঞাত ১২/১৩জনকে এ মামলায় আসামী করা হয়েছে। এদিকে সোমবার নকল ওষুধ উদ্ধারের পর গ্রেফতার কাজী শাহনেওয়াজকে গতকাল মঙ্গলবার খুলনা জেলা কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দিয়েছেন আদালত।

মঙ্গলবার বেলা ১১টার দিকে মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রূপসা থানার এসআই সাজেদুল ইসলাম রূপসা থানার হাজতখানা থেকে পুলিশ ভ্যানে করে গ্রেফতার শাহনেওয়াজকে খুলনার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মোঃ নাসির উদ্দিন ফরাজীর আদালতে হাজির করেন। শুনানী শেষে আদালত কাজী শাহনেওয়াজকে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দেন। মামলার পরবর্তী ধার্য্য তারিখ আগামী ২৫ অক্টোবর। দুই দিনের সরকারী ছুটি শেষে আগামী যে কোন এক কর্মদিবসে কাজী শাহনেওয়াজকে জিজ্ঞাসাবাদের জন্য আদালতে রিমান্ডের আবেদন জানানো হবে বলে জানান রূপসা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম।

গত সোমবার বিকালে খুলনার রূপসা উপজেলার পূর্ব রূপসার চর রূপসা এলাকায় কাজী শাহনেওয়াজের মালিকানাধীন শাহনেওয়াজ গ্রুপের মৎস্য প্রক্রিয়াজাত কারখানা শাহনেওয়াজ সী ফুডেঞ্চ  র‌্যাব অভিযান চালিয়ে এই নকল ওষুধ তৈরী কারখানার সন্ধান পায়। এসময় প্রতিষ্ঠানটির মালিক শিল্পপতি কাজী শাহনেওয়াজকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। র‌্যাব-৬ খুলনার পরিচালক অতিরিক্ত ডিআইজি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম অভিযানের নেতৃত্ব দেন। র‌্যাব-৬ খুলনার অধিনায়ক ও অতিরিক্ত ডিআইজি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম জানান, সম্প্রতি ঢাকার মিটফোর্ড হাসপাতাল এলাকায় ভ্রাম্যমাণ আদালত অভিযান চালিয়ে বেশ কিছু নকল ওষুধ উদ্ধার করে। অনুসন্ধানে তারা জানতে পারে ওই নকল ওষুধ খুলনা থেকে সরবরাহ করা হয়েছে। এ তথ্যের ভিত্তিতে খুলনার র‌্যাব সদস্যরা বেশ কিছু দিন গোয়েন্দা নজরদারি করে চর রূপসা এলাকায়। পরে নিশ্চিত হয়ে শাহনেওয়াজ সি ফুডে অভিযান চালায় র‌্যাব।

তিনি জানান, এই কারখানায় গোপনে বিভিন্ন নামীদামি ব্রান্ডের নকল ওষুধ বানানো হতো। অভিযানের পর এসিআই কোম্পানির এন্টিবায়োটিক ফ্লুক্লক্স ক্যাপসুল পাওয়া গেছে প্রায় ৩ লাখ ৭৫ হাজার পিস। রেনিটিড ট্যাবলেট পাওয়া গেছে ১ বস্তা। বিভিন্ন নামের ওষুধ আছে আরও ৪ বস্তা। ওষুধের খালি খোসা আছে প্রায় আড়াই লাখ পিস। আছে নকল ওষুধের কাঁচামাল, চালেরগুড়া, কসমেটিক, কেমিক্যাল, পাউডারসহ ওষুধ তৈরীর যন্ত্রপাতি। এ বিষয় এলাকাবাসী বলেন শিল্পপতি কাজী শাহনেওয়াজ চিংড়িতে পুশ বানিজ্যের মুল হোতা। এ ছাড়া তিনি নকল ওষুধ তৈরী সহ নানা বিধ অপরাধমুলক কাজের সাথে জড়িত তাকে রিমান্ডে এনে জিজ্ঞসাবাদ করলে অনেক তথ্য জানা যাবে।

একাধিক সুত্র জানায়, খুলনা জেলা আওয়ামী লীগের সাবেক সহ-সভাপতি, চেম্বারের সাবেক সিনিয়র সহ-সভাপতি, হিমায়িত চিংড়ি রফতানিকারকদের সংগঠন বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের সাবেক সভাপতি কাজী শাহনেওয়াজ ব্যাংক, বীমা থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ করে গণপূর্ত বিভাগের কেরানী থেকে শিল্পপতি বনে গেছেন। ধনকূবের এই শিল্পপতি অর্থ উপার্জনের জন্য এমন কোন অপকর্ম নেই যা তিনি করেননি। ঠিকাদারী, পরিবহন ব্যবসা, চিংড়ি ব্যবসা, হিমায়িত চিংড়ি রফতানিকারক হিসেবে কাজ করলেও ব্যাংক, বীমা থেকে কোটি কোটি টাকা আত্মসাৎ ও চিংড়িতে অপদ্রব্য পুশ করে রাতারাতি শত কোটি টাকার মালিক বনে যায় কাজী শাহনেওয়াজ। আর এ সব কিছুই করেন ক্ষমতাসীন দলের পৃষ্ঠপোষকতায়। অপকর্ম জায়েজ করার জন্য বিভিন্ন দফতরে নিজেকে প্রধানমন্ত্রীর ভাই শেখ হেলাল উদ্দিনের কাছের লোক বলে দাবি করতেন।

তার এ সব অপকর্ম ফাস হয়ে যায় সোমবার সন্ধ্যায় র‌্যাবের নকল ওষুধ তৈরির কারখানা ও কোটি টাকার নকল ওষুধসহ গ্রেফতার হবার পরে। রাবার গলিয়ে তৈরি করা হতো ক্যাপসুলের ক্যাপ। যা মানব দেহের জন্য খুবই ক্ষতিকর। এছাড়া ক্যাপসুলের মধ্যে ভরা হতো আটা, ময়দা ও চালের গুঁড়া। এসব তথ্য পেয়ে র‌্যাব কর্মকর্তারা বিস্মিত হয়েছেন। গত মঙ্গলবার এ সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশিত হওয়ায় খুলনা জুড়ে ব্যাপক প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি হয়েছে। অফিস, আদালত, পাড়া-মহল¬া, চায়ের দোকানগুলিতে ‘শিল্পপতি শাহনেওয়াজের গ্রেফতার’ নিয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় ওঠে। ফেসবুকেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া পরিলক্ষিতি হয়েছে। সর্বপরি গতকাল টক অব দ্যা টাউন ছিলো ‘শিল্পপতি শাহনেওয়াজের গ্রেফতার’ ঘটনা। এদিকে গতকাল মঙ্গলবার কাজী শাহনেওয়াজকে খুলনার জুডিশিয়াল ম্যাজিষ্ট্রেট নাসির উদ্দিন ফারাজীর আদালতে হাজির করা হয়। আদালত তাকে কারাগারে প্রেরণ করেন।

দলীয় ও সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ১৯৭২ সালে কাজী শাহনেওয়াজ নড়াইল থেকে এসে ভর্তি হন খুলনার আযম খান কমার্স কলেজে। অসচ্ছলতার কারণে মেস ভাড়া দিয়ে মেসে থাকতে না পেরে স্মরনাপন্ন হন কলেজের তৎকালীন অধ্যক্ষ আবুল বাশারের নিকট। তিনি তার পরিবারের অর্থনৈতিক দৈন্যদশার কথা শুনে কলেজ ক্যাম্পাসে অধ্যক্ষের বাসভবনের চিলে কোঠার একটি রুমে থাকতে দেন। লেখাপড়ার পাশাপাশি সে বাজার করাসহ বাসার কাজকাম করতো। এভাবেই তিনি লেখাপড়া শেষ করেন। তার গ্রামের বাড়ি নড়াইল হবার সুবাদে ১৯৭৪ সালের দিকে খুলনার রক্ষীবাহিনী প্রধান নড়াইলের বাসিন্দা নিতিশ সাহার সাথে সখ্যতা গড়ে তোলেন। তখন নগরীর রূপসা হতে ফুলবাড়ি দাপিয়ে বেড়ান কাজী শাহনেওয়াজ। এ সময় তিনি খুলনার গণপূর্ত বিভাগের কেরানির (অফিস সহকারী) চাকরি নেন।

সুচতুর শাহনেওয়াজ চাকরির আড়ালে নামে-বেনামে ঠিকাদারী ব্যবসা শুরু করেন। এক পর্যায়ে তিনি চাকরি ছেড়ে দিয়ে সরাসরি ঠিকাদারী লাইসেন্স করে ব্যবসায় নেমে পড়েন। রক্ষীবাহিনীর সদস্য হওয়ায় তিনি প্রকাশ্যে অস্ত্র নিয়ে ঘোরাফেরা করতেন। তখন ঠিকাদাররা তাকে ‘পিস্তল কাজী’ বলে ডাকতেন। কৌশলী এই কাজী শাহনেওয়াজ ঠিকাদারী বিল ছাড়াতে গিয়ে তার মাজায় থাকা পিস্তলটি নির্বাহী প্রকৌশলীর টেবিলে রেখে বলতেন-‘ওয়েট বেশি তাই আপনার টেবিলের উপরে রাখলাম, মাইন্ড করবেন না তাড়াতাড়ি বিলটি ছাড়েন’। ঠিকাদারী ব্যবসা চলাকালীন সময়ে ‘তুলি-বুলি’ নামে ঢাকা-খুলনা পরিবহন সার্ভিস চালু করেন।

অভিযোগ রয়েছে, ইন্সুরেন্সের টাকা আদায় করার জন্য একাধিকবার দুর্ঘটনার নাটক করে লক্ষ লক্ষ টাকা হাতিয়ে নেন। এ ব্যবসা গুটিয়ে হিমায়িত চিংড়ি মাছ কোম্পানীতে মাছ সরবরাহ শুরু করেন। এসময় মাছে অপদ্রব্য পুশ করার অভিযোগে মাছ কোম্পানীরা তার কাছ থেকে মাছ নেয়া বন্ধ করে দিয়ে তাকে কালো তালিকাভুক্ত করেন। কিন্তু তাতে দমেননি শাহনেওয়াজ। ব্যাংকের ঋণ নিয়ে নিজেই মাছ কোম্পানী ‘শাহনেওয়াজ সী ফুডস’ প্রতিষ্ঠা করেন। ৯০ দশকে তার কোম্পানী থেকে হিমায়িত মাছ সরিয়ে ব্যাংকের টাকা আত্মসাৎ করার জন্য এ্যামোনিয়া গ্যাস লিক করেন। তখন পত্র-পত্রিকায় একাধিক প্রতিবেদন প্রকাশিত হওয়ায় ব্যাপক তোলপাড়ের সৃষ্টি হয়। এরপরেও তার অপকর্ম থেমে থাকেনি। জনতা ব্যাংক থেকে প্রায় দশ কোটি টাকা ঋণ নিয়ে কৌশলে আত্মসাৎ করেন। এ ব্যাপারে সংশ্লিষ্ট ব্যাংক কর্তৃপক্ষ মামলাও করেছিলেন। তবে কালো টাকা ও ক্ষমতার দাপটে তাকে কেউ গ্রেফতার করতে পারেনি।

জাতীয় পার্টির ক্ষমতার সময় তৎকালীন মন্ত্রী কর্নেল (অব) গফ্ফার ও স্থানীয় নেতাদের সাথে ছিল তার দহররম মহররম সম্পর্ক। বিএনপি’র শাসনামলেও মন্ত্রী, এমপিদের সাথে সুসম্পর্ক রেখে দাপটের সাথে অপকর্ম চালিয়ে গেছেন। আওয়ামী লীগ সরকার ক্ষমতায় আসার পরে সে আর ধরাকে সরা জ্ঞান করতেন। প্রধানমন্ত্রীর ভাই শেখ হেলাল উদ্দিনের নাম ব্যবহার করে খুলনা থেকে ঢাকা সব জায়গায় তিনি দাপিয়ে বেড়িয়েছেন। বিগত জেলা আওয়ামী লীগের কমিটিতে কাজী শাহনেওয়াজ ছিলেন সহ-সভাপতি। কালো টাকার জোরে সমাজের ব্যবসায়ী, সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হয়েছেন একাধিকবার। পর্যায়ক্রমে তিনি বাংলাদেশ ফ্রোজেন ফুডস এক্সপোর্টার্স এসোসিয়েশনের সভাপতি ও খুলনা চেম্বার অব কমার্সের সিনিয়র সহ-সভাপতি নির্বাচিত হন। তবে এ নিয়ে ব্যবসায়ীদের মাঝে রয়েছে নানা রকম আলোচনা। স্বাভাবিক প্রক্রিয়ায় কোনো পদে তিনি নির্বাচিত হননি বলে অভিযোগ রয়েছে।

ধনকুপদের প্রতিষ্ঠান হিসেবে পরিচিত খুলনা ক্লাবের আজীবন সদস্য হিসেবেও রয়েছে তার আধিপত্য। কাজী শাহনেওয়াজ ব্যক্তিগত জীবনে তিন মেয়ে ও এক ছেলের জনক। তার বড় জামাই আদর খুলনা জেলা ও মহানগর পুলিশের তালিকাভুক্ত সন্ত্রাসী। হত্যা, অপহরণ, চাঁদাবাজীসহ ডজনখানেক মামলা রয়েছে তার বিরুদ্ধে। অভিযোগ রয়েছে, সোমবারে র‌্যাবের অবিষ্কার করা ভেজাল ওষুধ কারখানাটি দেখভাল করতো জামাই আদর। এছাড়া তার রয়েছে মাদক ও অস্ত্র ব্যবসা। কাজী শাহনেওয়াজের হাত থেকে রক্ষা পায়নি তার মেয়ে জামাইরাও। খুলনায় এক অভিযাত হোটেলের পরিচালক ছিল তার জামাতা। মতের বিপক্ষে যাওয়ায় তার বাড়ি থেকে বন্দুক নিয়ে কথায় কথায় ধাওয়া করতো। একপর্যায়ে সে মেয়ে ছেড়ে দিয়ে নিরাপত্তার আশ্রয় চেয়েছিল আইন শৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর কাছে। সে মেয়েকে পরে চরমপন্থী আদারের সাথে বিয়ে দেয়। একই অবস্থা হয় দ্বিতীয় মেয়েরও। তার হাত থেকে রক্ষা পেতে সাংবাদিক জামাইও মেয়েকে ডিভোর্স দেয়। পরে সে মেয়েকেও অন্যত্র বিয়ে দেয়। এভাবেই পরিবার থেকে শুরু থেকে সমাজের সর্বস্তরে তার ক্ষমতার অপব্যবহার করার অভিযোগ রয়েছে।

সোমবার বিকেলে তার নকল ওষুধ করাখানায় অভিযানের খবর পেয়ে ছুটে যান তিনি। সেখানে র‌্যাব কর্মকর্তাদের সামনে হুংকার দিয়ে বলেন, ‘আপনারা কার কেম্পানিতে ঢুকছেন জানেন? সরকারের ঊর্ধ্বতন মহলের অনুমতি নিয়েছেন? এর খেসারত আপনাদের দিতে হবে’। এ সময়ে র‌্যাব কর্মকর্তাদের সাথে তার উত্তপ্ত বাক্য বিনিময় হয়। একপর্যায়ে র‌্যাব তাকে গ্রেফতার করে। র‌্যাব জানায়, খুলনার চর রূপসার রফতানিযোগ্য হিমায়িত মাছ প্রক্রিয়াজাতকরণ প্রতিষ্ঠান ‘শাহনেওয়াজ সি ফুডস’ বন্ধ রয়েছে প্রায় ১০ মাস। এই সময়ের মধ্যে প্রতিষ্ঠানটির অফিস ভবনের দোতলায় প্রিন্স ডিস্ট্রিবিউশন এন্ড কোম্পানি নামে একটি প্রতিষ্ঠান হারবাল ওষুধ, কসমেটিক, পাউডার, সিল্কী শ্যাম্পু, সরিষার তেল, হারবাল মেছতা ক্রিম, স্পট ক্রিম, চিরতা ক্যাপসুলসহ নানা ধরণের এনার্জি ট্যাবলেট ও ক্যাপসুল উৎপাদন শুরু করে। এই প্রতিষ্ঠানটি শাহনেওয়াজ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজের অঙ্গ প্রতিষ্ঠান। দেশের বিভিন্ন নামিদামী কোম্পানীর নাম ব্যবহার করে এখানে দীর্ঘদিন ধরে মৎস্য প্রক্রিয়াজাত কারখানার আড়ালে নকল ওষুধের অবৈধ কারবার চলে আসছিলো বলে জানায় র‌্যাব। জীবন রক্ষাকারী এ সকল ওষুধ নিয়ে এ ধরনের প্রতারণায় ক্ষুব্ধ সাধারণ মানুষ।

সম্প্রতি ঢাকার মিটফোর্ডসহ (স্যার সলিমুল্লাহ মেডিকেল কলেজ ও হাসপাতাল) বিভিন্ন হাসপাতালের অভিযান চালিয়ে ভেজাল ওষুধসহ কয়েকজনকে গ্রেফতার করে র‌্যাব। পরে তাদেরকে জিজ্ঞাসাবাদে নকল ওষুধ তৈরির কারখানা ও এর সাথে জড়িত একটি চক্রের খোঁজ মেলে। তাদের দেয়া তথ্যের ভিত্তিতে গত দু’দিন ধরে খুলনায় এই মাছ কোম্পানিতে নজরদারি শুরু করে র‌্যাবের গোয়েন্দা সদস্যরা। ঘটনা নিশ্চিত হওয়ার পর সোমবার দুপুর থেকে শুরু হয় র‌্যাব-১ ও র‌্যাব-৬ এর যৌথ অভিযান। অভিযানে স্বনামধন্য ওষুধ কোম্পানির নাম ব্যবহার করে ভেজাল ওষুধ উৎপাদন, সংরক্ষণ ও বিক্রয়ের অপরাধে শাহনেওয়াজ গ্রুপ অব ইন্ডাস্ট্রিজ এর মালিক কাজী মো. শাহনেওয়াজ (৬৮), পিতা-মৃত কাজী ফজলে এবং শরিফ রহমান, সাং-৬৬ রূপসা স্ট্রান্ড রোড, থানা-কোতয়ালী, জেলা-খুলনাকে বিপুল পরিমাণ ভেজাল ওষুধ ও ওষুধ উৎপাদনের যন্ত্রপাতিসহ হাতে-নাতে গ্রেফতার করা হয়।

র‌্যাবের নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. ফিরোজ আহম্মেদ জানান, চক্রটি দেশের বিভিন্ন হাসপাতাল থেকে অর্ডার নিয়ে এখানে গোপনে নকল ওষুধ তৈরি করতো। অভিযান শুরুর আগে চক্রের সবাই পালিয়ে গেছে। র‌্যাবের অভিযানে ওই প্রতিষ্ঠানের উৎপাদিত পণ্যও ভেজাল বলে প্রমাণিত হয়। রাতারাতি মেশিনপত্র বসিয়ে নামীদামী কোম্পানির লেবেল দিয়ে নকল ওষুধ তৈরি শুরু করে। উদ্ধারকৃত নকল ওষুধের মধ্যে রয়েছে, এসিআই ফার্মাসিউটিক্যালস’র নাম ব্যবহার করে তৈরি করা দুই হাজার ৬০০ পিচ নকল ক্যাপসুল ফ্লুক্লক্স ৫০০ এমজি, এছাড়াও ক্যাপসুল ফ্লুক্লক্স ৫০০ এমজি ৫ বস্তা, অপসোনিন ফার্মাসিউটিক্যালস’র এক বস্তা রেনিটিড ১৫০ এমজি, আড়াই লাখ পিচ ক্যাপসুল শেল উইথ ফিলড পাউডার, ট্যাবলেট কনপ্রিরেড চার হাজার পিচ, এসিআই ফার্মাসিউটিক্যালস’র ৫০০ এমজি ফ্লুকক্স ক্যাপসুল তৈরির ফয়েল পাঁচ কেজি, এসকেএফ ফার্মাসিউটিক্যালস’র ৫০০ এমজি ফ্লুক্লক্স তৈরির ফয়েল আড়াই কেজি, প্রিন্স ফার্মাসিউটিক্যালস এন্ড হার্বাল ইন্ডাষ্ট্রিজের টেস্টি স্যালাইন দুইশ’ বস্তা, ক্যাপসুলের খালি খোসা তিন লাখ ৫০ হাজার পিচ, প্রিন্স গুরু মুভ ক্রীম পাঁচ হাজার ৭৬০ পিচ, এছাড়াও নকল ওষুধ তৈরির বিভিন্ন যন্ত্রপাতি উদ্ধার করা হয়। উদ্ধারকৃত মালামালের মূল্য কোটি টাকার ওপরে । বিশাল প্রতিষ্ঠানের মূল ফটকে সবসময় কড়া প্রহরা থাকে।

প্রতিষ্ঠানটির অভ্যন্তরে ঢুকে বাঁ হাতে দোতলা মাছ কোম্পানির সাবেক প্রশাসনিক ভবনে এই নকল ওষুধ তৈরির কারখানা করা হয়েছে। এখানে চালের গুঁড়া ও কেমিকেল দিয়ে মানব স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর নকল ওষুধ তৈরি করতো। পরে উৎপাদিত নকল ওষুধ মাছ কোম্পানির গাড়িতে করে বিপণন করতো। উদ্ধারকৃত মালামালসহ গ্রেফতারকৃত আসামিদের রাতেই খুলনা জেলার রূপসা থানায় হস্তান্তর করা হয়। তবে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে রাতেই শরীফকে ছেড়ে দেয়া হয়। র‌্যাবের ডিএডি নাজমুল হুদা বাদি হয়ে ওষুধ উৎপাদন ও সংরক্ষণে ১৯৭৪ সালের বিশেষ ক্ষমতা আইনের ২৫(গ) ধারায় মামলার দায়ের করেন। মামলার আসামীরা হলেন, শাহনেওয়াজ সী ফুডসের মালিক আওয়ামী লীগ নেতা কাজী শাহনেওয়াজ, ঢাকার ৭৩, শান্তিবাগ মসজিদ রোডের বাসিন্দা মৃত সাইফল্লাহ’র ছেলে মো. জাকির হোসেন (৪৮), খুলনার বাগমারা পূর্ব রূপসা এলাকার মো. আনোয়ার হোসেন বেগ’র ছেলে মো. হাবিবুর রহমান শেখ (৪৫), সিরাজগঞ্জের মো. স্বপন শেখের ছেলে সজিব (৩৫)। এছাড়া মামলায় অজ্ঞাত আরো ১২/১৩ জন সহযোগির আসামীর কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মামলা নং-৪। এদের মধ্যে গ্রেফতারকৃত কাজী শাহনেওয়াজকে মঙ্গলবার বেলা ১১টায় মামলার তদন্তকারী কর্মকর্তা রূপসা থানার এসআই সাজেদুর রহমান খুলনার জুডিশিয়াল ম্যাজিস্ট্রেট মুহাম্মদ নাছির উদ্দিন ফরাজী তাকে কাস্ট্ররি ওয়ারেন্ট (সিডব্লিউ) মুলে কারাগারে প্রেরণের নির্দেশ দিয়েছেন। আদালতের নির্দেশে পুলিশ তাকে খুলনা জেলা কারাগারে হস্তান্তর করেছে। মামলার পরবর্তী তারিখ আগামী ২৫ অক্টোবর।

এ ব্যাপারে রূপসা থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা মো. রফিকুল ইসলাম বলেন, ছুটির পরে আসামীর রিমান্ড চেয়ে আদালতে আবেদন করা হবে। বাকী আসামীদের গ্রেফতারে অভিযান অব্যাহত রয়েছে।

খুলনার র‌্যাব-৬ এর অধিনায়ক ও অতিরিক্ত ডিআইজি খোন্দকার রফিকুল ইসলাম জানান, গোপন সংবাদের ভিত্তিতে নকল ওষুধ তৈরি ও বাজারজাতের বিষয়টি নিশ্চিত হওয়ার পর চর রূপসার ওই কারখানায় অভিযান চালানো হয়।

তিনি বলেন, এই কারখানায় গোপনে বিভিন্ন নামীদামী ব্র্যান্ডের নকল ওষুধ তৈরি হতো। পরে এসব ভেজাল ওষুধ দেশের বিভিন্ন স্থানে পাঠানোর খবর ছিলো আমাদের কাছে। গোয়েন্দা নজরদারির পর নিশ্চিত হয়েই শাহনেওয়াজ সি ফুডে অভিযান চালানো হয়।

শাহনেওয়াজ সি ফুডের মালিক কাজী শাহনেওয়াজ জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে কোম্পানি বন্ধ থাকায় তিনি এখানে আসতেন না। দুই মাস আগে জাকির হোসেন নামে একজনের কাছে তিনি ভবনটি ভাড়া দেন। কিন্তু এইসব ঘটনার ব্যাপারে তিনি কিছু জানেন না।

র‌্যাব পরিচালক জানান, এই কারখানায় গোপনে বিভিন্ন নামীদামি ব্রান্ডের নকল ওষুধ বানানো হতো। তিনি বলেন, সমাজের এলিট শ্রেণীর লোকেরা যদি এ ধরনের ভয়ংকর কাজের সাথে জড়িত থাকেন, তাহলে সাধারণ মানুষ যাবে কোথায়। শিল্পপতি কাজী শাহনেওয়াজ হলেন শাহনেওয়াজ গ্রুপের চেয়ারম্যান ও ব্যবস্থাপনা পরিচালক।

র‌্যাব-১ এর নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট মো. ফিরোজ আহম্মেদ জানান, প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, ঢাকার মিটফোর্ডসহ বিভিন্ন হাসপাতালের সঙ্গে এই চক্রটির যোগাযোগ রয়েছে। তারা ওই সব হাসপাতাল থেকে অর্ডার নিয়ে গোপনে নকল ওষুধ তৈরি করে। অভিযান শুরুর আগে ওই চক্রের সবাই পালিয়ে গেছে।

খুলনার ড্রাগ সুপার মাহমুদ হোসেন বলেন, কাজী শাহনেওয়াজ নকল ওষুধ তৈরি ও সংরক্ষণ করে যে অপরাধ করেছেন তা’ আদালতে প্রমাণিত হলে তার সর্বোচ্চ শাস্তি মৃত্যুদন্ডের বিধান রয়েছে।

বাংলাদেশ কেমিস্ট এন্ড ড্রাগিস্ট সমিতি কেন্দ্রীয় কমিটির সহ-সভাপতি ও খুলনা জেলা সভাপতি মো. মোজাম্মেল হোসেন বলেন, নকল ওষুধের কারণে আমরা ব্যবসায়ীরা দারুণভাবে বিভ্রান্ত ও বিব্রতকর অবস্থায় পড়ছি। এধরনের নকল ওষুধ যে বা যারা সরবরাহ করে সাধারণ মানুষের জীবন সংকটাপন্ন করে তুলছেন তাদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেয়ার জন্য তিনি সরকারের প্রতি আহ্বান জানান।

ফেসবুকে সমালোচনার ঝড় : সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম ফেসবুকে কাজী শাহনেওয়াজের গ্রেফতার ও ভেজাল ওষুধ কারখানা আবিস্কারের বিষয়ে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার জঢ় উঠেছে। গাজী আলাউদ্দিন আহমদ তার স্ট্যাটাসে লিখেছেন-এরশাদ শিকদারকে যখন ধরা হয়েছিল, তখন সেও ক্ষমতাসীন দলের নেতা ছিল। তার মত কাজী শাহনেওয়াজের সুবিধাভোগী মিডিয়াতেও আছে। তাই অসংখ্য মানুষের জীবন বিপন্নকারী এই অপরাধীকে বিচারের মুখোমুখি করতে হুমকি-ধামকি ও লোভ-লালসা উপেক্ষা করে নতুন প্রজন্মের সাংবাদিকদের অগ্রণী ভূমিকা পালন করতে হবে, সহযোগিতা করতে হবে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও বিচার বিভাগকে, যেমনটি হয়েছিল এরশাদ শিকদারের বেলায়। যতক্ষণ পর্যন্ত অপরাধীর সাজা সুনিশ্চিত না হবে ততক্ষণ ওয়াচডগের ভূমিকা পালন করতে হবে সাংবাদিকদের। তার এ স্ট্যাটাসে কমেন্ট করে মহগিণ হোসেন লিখেছেন, ‘টাকার কাছে আমরা বারবার হেরে যাই। আবার অনেক অপরাধীর টাকা থাকলেও বিচার হয়েছে। জানি না এই নেপথ্যের হত্যাকারীর বিচার হবে কি না?’ রূপসার রবিউল ইসলাম তোতা লিখেছেন, ‘দু’জনের একজন হল রাঙা চোরা অন্যজন কালাচোরা। অপরাধের দিক থেকে দু’জনই ভয়ংকর। তাহলে রাঙা চোরার ফাঁসি হলে কালা চোরার কি হবে? জনগণ দেখার অপেক্ষায়!

অন্যরা য়া পড়ছে...

Loading...



চেক

বিকল্পের সন্ধানে কোটা বাতিলের প্রজ্ঞাপনে দেরি হচ্ছে : ওবায়দুল কাদের

ঢাকা, ১৩ মে ২০১৮ইং (বাংলা-নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম): প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ঘোষণা অনুযায়ী সরকারি চাকরিতে কোটা …

স্যাটেলাইট মহাকাশে ঘোরায় বিএনপির মাথাও ঘুরছে : মোহাম্মদ নাসিম

ফেনী, ১৩ মে ২০১৮ইং (বাংলা-নিউজ টুয়েন্টিফোর ডটকম): বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ মহাকাশে উৎক্ষেপণ হওয়ায় বিএনপির মাথাও ঘুরছে …

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

My title page contents